জীবন যুদ্ধ

 


মন খারাপ!

আত্মহত্যা করতে চাচ্ছেন? মনে হচ্ছে সবকিছুতে হেরে যাচ্ছেন?


চলুন ঘুরে আসি। কোথায় যাবো সেটা তো গেলেই দেখতে পাবেন। উঠুন বাইকে। আমাকে প্রথম বসু নিয়ে গিয়েছিলো। এর আগেও গিয়েছিলাম নিজ প্রয়োজনে। এদিক ওদিক দেখার সময়ই হয়নি। এইযে এসে গেছি ইমার্জেন্সি গেট দিয়ে ঢুকে বাম পাশে বার্ণ ইউনিটে। না না ঝলসানো পোড়া দেখাবোনা। সবথেকে কম রোগীদের দেখবেন। ৪র্থ তলায়। কোনটায় ঢুকবেন? মহিলা ওয়ার্ড নাকি পুরুষ? মহিলা ওয়ার্ড আরেকদিন দেখবেন আজকে ডানপাশের পুরুষ ওয়ার্ডটাই দেখি।


বেড M-3: ইয়ং ছেলে বয়স কত হবে ১৮-১৯। বাড়ী কুমিল্লা। টুকটাক পড়ালেখা করে। বাবা মার কাজ করে দেয়। এই বয়সের ছেলেদের যা হয় আর কি। পাড়ার নেতাদের পাওয়ারে পাড়া কাঁপায়। সেরকমই! কোনো এক প্রোগ্রামে নেতার সাথে শোডাউন দিতে যাচ্ছিল। ভিতরে জায়গা না হওয়ায়। বাসের ছাদে উঠেছিলো। আনন্দে লাফালাফি করছিলো। হঠাত সামনে বিদ্যুৎতের তাড় মাথায় লাগে। তাড় ছিড়ে বাসে লেগে পুরো বাস কারেন্ট হয়ে যায়। ছাদে ৫ জন ছিলো ৪ জন আইসিউতে একজন এই বেডে। ওই নেতাকে দেন দরবার করে ৩০ হাজার টাকা, এবং বেশি আহত জনকে ১ লক্ষ টাকা ব্যবস্থা করে। একটু অসাবধানতাবসত এখন একটি হাত কাটা গেলো। হয়তো শুয়ে শুয়ে প্রতিজ্ঞা করছে আর জীবনেও বাবা মার অবাধ্য হবেনা।


বেড M-4: আজকে ছাড়পত্র পেয়েছে। দুই মাস যাবত ছিলো এই বেডে। বয়স ৯-১০ বছর হবে। সুপারী গাছে উঠেছে পাশের বাড়ির দাদীর অনুরোধে। পাশে বিদ্যু লাইন ছিলো। গাছ হেলে তাড়ের উপর পরে। সাথে সাথে হাত পা বুক পুড়ে যায়। একটা পা কেটে ফেলতে হয়েছে। তাও ভালো বেঁচে আছে।


বেড M-5: নতুন বাইক কিনেছে। বয়স ২৪-২৫ হবে। ভাবীকে নিয়ে ঘুরতে বেড়িয়েছে। পিছনে ট্রাক ধাক্কা দিলে ভাবী পড়ে গিয়ে তিন টুকরা হয়ে জায়গায় মারা যান। উনি গিয়ে একটু দূরে পড়েন। পা পুড়ে যায়। ওই অবস্থায়ই ভাবীর মাথার অংশটা নিয়ে ছুটেন হাসপাতালে। ভাবীকে বাঁচাতে হবে। সবাই ধরে তাকে আলাদা করে হাসপাতালে নেন। সারাদিন শুধু ওই একটাই কথা ভাবীকে বাঁচান।


বেড :M-6: বয়স ১৮-১৯। আর্মিতে চাকুরী হয়েছে। জয়েন করবে আগামী ১০ তারিখ। কিন্তু টয়লেটে ধুমপান করার অভ্যাস অনেকেরই তারও সেরকম অভ্যাস। সকালবেলা সিগারেট নিয়ে টয়লেটে ঢুকেন। কিন্তু টয়লেটে এক ধরনের গ্যাস সৃষ্টি হয় সেই গ্যাসে সিগারেটের আগুনকে আকর্ষণ করে। হাত মুখ এবং নিতম্ভের অনেকটা পুড়ে যায়। হাসপাতালের বেডে শুধু এই বলে চিল্লাচ্ছে ডাক্তার ১০ তারিখে আর্মিতে জয়েন। পারবোতো জয়েন করতে। আমাকে বাঁচান।


বেড M -9: বয়স ১১-১২ বছর হবে। নতুন মোবাইলে সেলফি তুলতে বাসার ছাদে উঠে। কিন্ত অসাবধানতাবসত ছাদের কিনারে চলে যায়। বিদ্যুৎতের মূল লাইনে হাত লাগে, তারপর মাথা। হাত অর্ধেক কেটে ফেলা হয়েছে। তারপরও বাঁচার কি আকুতি।


বেড M-10 :বয়স ৫০-৫৫ হবে। তাবলীগ করে। শুভ্র দাড়ি। চল্লিশ দিনের চিল্লায় যাবে। পথিমধ্যে গাড়ি উল্টে গাড়ীর এসিড এবং গরম পানি তাঁর পুরো শরীরে। হাত দিয়ে ডলতে গিয়ে হাতও পুড়ে যায়। পুরো শরীর ব্যান্ডিজে মোড়ানো। তাকিয়ে আছে অপলোক চোখে। বাঁচার সে কি ইচ্ছে।


বেড M-11: বয়স ২৮/২৯ হবে। বিয়ে করেছে। এক বছরের বাচ্চা একটা। স্টিল মিলসে কাজ করে। যেখানে লোহা গলিয়ে রড বানানো হয়। গলিত লোহা ছিটকে গায়ে পড়েছে। ৪/৫ জন আহত হয়েছে। পুরো শরীর ব্যান্ডিজ। বাচ্চাটার দিকে তাকাচ্ছে আরো কিছু দিন বাঁচতে চায় সে।


বেড M-12: নাম নেছার। বাসা বরিশাল। বয়স ১৬/১৭ হবে। বাবা বোবা। কাজ করতে পারেনা তেমন। মা কাজ করে খাওয়াতো। দুই ভাই বেকারীতে চাকুরী করে স্বচ্ছলতা এনেছে। ভাগ্যোন্নয়নে ঢাকায় তামা গলিয়ে তাড় বানানোর ফ্যাক্টরিতে নয় হাজার টাকায় কাজ করে। ভাগ্যের ফের। মেশিন আঙ্গুল সহ হাতের কবজি পর্যন্ত ঢুকে যায়। পেটের সাথে লাগিয়ে চামড়া প্রতিস্থাপনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। দুই ভাই এখানে। এত বড় অপারেশন। মাকে জানায়নি। জানালে কষ্ট পাবে। তাই সামান্য হাতকাটা বলে চালিয়ে দিয়েছে। চিকিৎসা খরচ মহাজন চালাচ্ছে। কাজ করার সে কি ইচ্ছা, সে কি স্পৃহা। পরিবারে স্বচ্ছলতা আনবে। জীবনে ফিরবে সুখের পরশ।


বেড M-14: একটা ছেলেকে তার বোন ভাত খাইয়ে দিচ্ছে। বাবা মা দুই পাশে বসা। বাসার সবাই বেড়াতে গেছে। সেও দুই দিন বেড়িয়ে বাসায় ফিরছে। সামনে ইন্টার পরীক্ষা বেশিদিন বেড়াতে পারেনি। বাসায় এসে রান্না চড়ানোর জন্য গ্যাসের চুলায় আগুন দিতে গেলো, আগে গ্যাস বের হচ্ছিল। হঠাৎ আগুনের ঝলসানি চেহারায় লাগে। উল্টো ঘুরে দৌড় দিলে পিঠেও লাগে। সটান হয়ে বসে খাচ্ছে সে, আর তাকিয়ে আছে দেয়ালের দিকে। হয়তো স্বপ্ন আঁকছে নতুন করে বাঁচার। চেহারা নষ্ট হয়েছে তো কি হয়েছে।


চলুন দুপুরে খাই। ২ ঘন্টা হয়ে গেছে এখানে দাড়ানো। মন খারাপ আছে? নাকি বেঁচে থাকার ইচ্ছা আবার জেগেছে। ভালো আছেন না তাদের চেয়ে? তাদের বাঁচার আকুতি দেখেছেন। এক হাত, এক পা যাওয়ার পরও বাঁচার সে কি ইচ্ছা। জীবনের বাঁচার আকুতি পৃথিবীতে ধর্ম রক্ষার চেয়েও বড়। জীবন নিয়ে সাবধান হবেন তো। একটু ভুল, একটু অবহেলা আর ফিরাবে না আপনাকে। আপনি কাউকে না কাউকে ক্ষমা করতে পারেন। কিন্তু জীবন কখনো ক্ষমা করেনা। সময়েই প্রতিশোধ নিয়ে ফেলে জীবন। আর যাই করেন জীবনকে অবহেলা করবেননা।


এতক্ষণ যে গল্প গুলো শুনালাম। সবগুলো সত্য। বর্ণনার চেয়ে করুণ গল্প। যদি বিশ্বাস না হয় তবে ঢাকা মেডিকেলের বার্ণ ইউনিটের চার তলায় গিয়ে দেখতে পারেন আপনিও। আমার মন খারাপ থাকলে প্রায়ই এখানে যাই। একা একা ঘুরে দেখে আসি জীবন মরনের যুদ্ধ। কেউ কেউ হেরে যায় কেউ আবার জিতে হেসে ফিরে জীবন সংসারে।

----

জীবন যুদ্ধ 

৩০ ডিসেম্বর ২০১৭

বার্ন ইউনিট, ঢাকা মেডিকেল

©Mahmud Hasan

Post a Comment

Previous Post Next Post